রাঙ্গুনিয়ার সৌদিয়া প্রবাসী ইকবাল হোসেন (৪৭)। জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশে ফিরে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান। এরমধ্যে নির্বাচনের দুইদিন আগে যৌথবাহিনী তাকে নিজ বাড়ি থেকে দূরে উদ্ধার একটি অস্ত্র দিয়ে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। এরপর থেকে চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দিজীবন কাটছে এই প্রবাসীর। এরমধ্যে শনিবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে তাঁর মা আনোয়ারা বেগম হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যুতে জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় তাঁকে। পুলিশি পাহারায় মাকে শেষবিদায় জানান তিনি। মায়ের জানাজা ও দাফনে অংশ নেন হাতকড়া পরেই।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বাদে আসর রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের সাদেক শাহ্ (রাঃ) মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এই জানাজা। তিনি ওই ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড সাহেবনগর এলাকার মৃত নুরুল আলমের ছেলে। প্রথমে তাকে নিজ বাড়ির আঙিনায় রাখা মায়ের লাশের পাশে আনা হয়৷ এরপর জানাজা মাঠে নেওয়া হয়। এসময় স্বজন ও তার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় পুরো এলাকা ও জানাজা মাঠজুড়ে৷
জানা যায়, মায়ের মৃত্যুতে রোববার বিকাল ৩টার দিকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তিনি বাড়ি গিয়ে মায়ের মরদেহ দেখেন। এরপর খাটিয়া কাঁধে বহন করে দাফনের জন্য নিয়ে যান। এ সময় তার হাতে হাতকড়া ছিল। হাতকড়ার একটি অংশ দড়ি লাগিয়ে পুলিশের হাতে দেখা যায়।
জানাজা মাঠে উপস্থিত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমি ২২ বছর সৌদি আরব প্রবাসে ছিলাম। দুই হাত উঁচিয়ে বলেন, সবাইকে সাক্ষি রেখে বলছি, আমার দুই হাতে কখনো কোন অপরাধ করিনি৷ চাদাবাজি, সন্ত্রাসী কোন অবৈধ কাজে কোনদিন জড়িত ছিলাম না। রাণীরহাট বাজারে প্রকাশ্যে হত্যার শিকার বড়ভাই জিল্লুর রহমান ভান্ডারী প্রসঙ্গে বলেন, ভাই হত্যাকারীদের সাথে আপোষ করিনি, এটাই ছিলো অপরাধ।
নিজের গ্রেফতার প্রসঙ্গে বলেন, “১০ ফেব্রুয়ারি ঘটনার দিন রাতে এলাকার ছেলেদের ঘুমাতে যেতে বলে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মধ্যরাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে পুরো ঘর তছনছ করে ফেলে এবং আমাকে বেধড়ক নির্যাতন করা শুরু করে। আমি বলেছি, মা শুনবে, শুনলে সহ্য করতে পারবেন না। তাই আস্তে কথা বলতে বলি। কিন্তু তারা আমাকে কয়েকদফা নির্যাতন করে বাড়ির সীমানার বাইরে খালের কাছে কোত্থেকে বন্দুক একটি এনে আমার হাতে দিতে চাই। হাতে নেয়নি বলে, আমাকে তারা নির্যাতন করে। কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রশাসনের যোগসাজশে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। আমি সুস্থ মাকে রেখে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার উপর এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমার মা মারা গেছেন।” কারা তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়েছে তাদের মুখোশ উন্মোচনের জন্য প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ দাবী করেন তিনি।
এসময় উত্তরজেলা যুবদলের সিনিয়র সহ সভাপতি ইউসুফ চৌধুরী, ইসলামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল মান্নান রনি, ভিপি শাহেদ কামালও বক্তব্যে প্রবাসী ইকবাল নির্দোষ, তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে দাবী করে নি:শর্ত মুক্তির দাবী জানান। এছাড়া প্যারোলে মুক্তির জন্য রাঙ্গুনিয়ার সাংসদ হুমাম কাদের চৌধুরী সহযোগিতা করেছেন জানিয়ে, তাঁর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তারা।
এদিকে রাঙ্গুনিয়ার সৌদিয়া প্রবাসী ইকবাল হোসেনকে গ্রেফতারের ঘটনায় এলাকাজুড়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশে ফেরা এই প্রবাসীকে পরিকল্পীতভাবে ফাঁসানো হয়েছে দাবী করে তার নি:শর্ত মুক্তির দাবী জানান এলাকাবাসী৷ গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তার মুক্তির দাবীতে উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় মুসল্লী, এলাকাবাসী, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনসহ বিভিন্ন স্তরের জনতা।
এতে বক্তারা দাবী করেন, সৌদিয়া প্রবাসী ইকবাল সম্প্রতি দেশে ফেরেন এবং রাঙ্গুনিয়ার নবনির্বাচিত সাংসদ হুমাম কাদের চৌধুরীর পক্ষে ভোট চেয়ে বাড়ি বাড়ি প্রচারণা চালান। এরমধ্যে ভোটের দুইদিন আগে গভীর রাতে যৌথবাহিনী তাকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। এসময় তার পুরোঘর তল্লাসি করেও অবৈধ কিছু পাওয়া যায়নি৷ বরং তার বাড়ি থেকে দূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি বন্দুক উদ্ধার হলে, এটি দিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়। অথচ পরিত্যক্ত অবস্থায় বন্দুকটি যেকেউ সেখানে রাখতে পারে। এটির সাথে ইকবালের কোন সম্পর্ক নেই। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অতিতেও কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের নজির নেই। বরং তার হাত ধরে একাধিক মসজিদ ভবন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নিয়মিত দান-অনুদান এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানসহ বিভিন্ন ভালো কাজের সাথে সে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। তার অবিলম্বে মুক্তির দাবী জানান তারা এবং ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবী করা হয়।
রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 









