চট্টগ্রাম 3:56 pm, Monday, 9 March 2026

সীতাকুণ্ডে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে

সন্ত্রাস দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে যৌথবাহিনী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সোমবার (৯ মার্চ) ভোর ৫টা থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এই অভিযান চালাচ্ছেন অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পরিচালিত এই অভযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিয়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ও দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের অবস্থান, অস্ত্র মজুদ ও অপরাধীদের আত্মগোপনের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে এই অভিযান শুরু করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে প্রায় ৫৫০ সেনাসদস্য, ১৮০০ পুলিশ, ৩৩০ এপিবিএন, ৪০০ র‍্যাব এবং ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি সহায়তায় রয়েছে সাঁজোয়া যান (এপিসি), ডগ স্কোয়াড ও হেলিকপ্টার। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ও ইউএভি ফুটেজের ভিত্তিতে সেনাবাহিনী অভিযানটির সার্বিক সমন্বয় করছে বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, অভিযান পরিচালনার জন্য সদস্যদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছে। একটি দল পাহাড়ের নিচের বসতিগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে, আরেকটি দল পাহাড়ি পথ ধরে উপরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সম্ভাব্য পালানোর পথগুলোতে আগেই চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, যাতে কেউ অভিযান শুরুর খবর পেয়ে এলাকা ছাড়তে না পারে।

অভিযানে অংশ নেওয়া একটি সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে একাধিক পাহাড়ি ছড়া, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত ঘর রয়েছে। এসব স্থানকে অনেক সময় অপরাধীরা আত্মগোপনের জন্য ব্যবহার করে। তাই সদস্যরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাচ্ছেন। কোথাও কোথাও পাহাড়ি পথ এতটাই সরু যে একসঙ্গে কয়েকজনের বেশি চলাচল করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ধাপে ধাপে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ভোর হওয়ার আগেই পাহাড়ের আশপাশে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অবস্থান নিতে দেখা যায়। পরে ধীরে ধীরে তারা পাহাড়ের ভেতরের দিকে অগ্রসর হন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি আরও জোরদার করা হয়।

জেলা পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মোঃ রাসেল বলেন, ‘সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুরো জেলায় যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের ভূপ্রকৃতি জটিল হওয়ায় এখানে অভিযান চালানো সব সময়ই চ্যালেঞ্জের। পাহাড়ের ভেতরে অসংখ্য সরু পথ, গহিন ঝোপঝাড় ও ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা বসতি থাকায় অপরাধীরা সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে পারে। এ কারণে গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গেলে র‍্যাব–৭, চট্টগ্রাম এর চার সদস্যকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এ সময় র‍্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব নিহত হন।

এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে বিশেষ নজরদারিতে রাখে। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই মামলার কয়েকজন আসামি পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করেছে—এমন তথ্য পাওয়ার পরই সেখানে নজরদারি বাড়ানো হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওই ঘটনার পর সন্ত্রাসী ও অস্ত্র উদ্ধারে একাধিক অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়। এর অংশ হিসেবেই সোমবার ভোর থেকে এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, অভিযানের সময় পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে সন্দেহভাজন কয়েকটি স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি আশপাশের বসতিগুলোতেও যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে।

এর আগে ২০১৭ ও ২০২২ সালেও প্রশাসন সেখানে অভিযান চালানোর চেষ্টা করলেও নানা কারণে তা পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে এবার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অংশ হিসেবে বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

সীতাকুণ্ডে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে

সীতাকুণ্ডে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে

Update Time : 02:03:51 pm, Monday, 9 March 2026

সন্ত্রাস দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে যৌথবাহিনী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সোমবার (৯ মার্চ) ভোর ৫টা থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এই অভিযান চালাচ্ছেন অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পরিচালিত এই অভযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিয়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ও দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের অবস্থান, অস্ত্র মজুদ ও অপরাধীদের আত্মগোপনের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে এই অভিযান শুরু করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে প্রায় ৫৫০ সেনাসদস্য, ১৮০০ পুলিশ, ৩৩০ এপিবিএন, ৪০০ র‍্যাব এবং ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি সহায়তায় রয়েছে সাঁজোয়া যান (এপিসি), ডগ স্কোয়াড ও হেলিকপ্টার। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ও ইউএভি ফুটেজের ভিত্তিতে সেনাবাহিনী অভিযানটির সার্বিক সমন্বয় করছে বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, অভিযান পরিচালনার জন্য সদস্যদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছে। একটি দল পাহাড়ের নিচের বসতিগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে, আরেকটি দল পাহাড়ি পথ ধরে উপরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সম্ভাব্য পালানোর পথগুলোতে আগেই চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, যাতে কেউ অভিযান শুরুর খবর পেয়ে এলাকা ছাড়তে না পারে।

অভিযানে অংশ নেওয়া একটি সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে একাধিক পাহাড়ি ছড়া, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত ঘর রয়েছে। এসব স্থানকে অনেক সময় অপরাধীরা আত্মগোপনের জন্য ব্যবহার করে। তাই সদস্যরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাচ্ছেন। কোথাও কোথাও পাহাড়ি পথ এতটাই সরু যে একসঙ্গে কয়েকজনের বেশি চলাচল করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ধাপে ধাপে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ভোর হওয়ার আগেই পাহাড়ের আশপাশে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অবস্থান নিতে দেখা যায়। পরে ধীরে ধীরে তারা পাহাড়ের ভেতরের দিকে অগ্রসর হন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি আরও জোরদার করা হয়।

জেলা পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মোঃ রাসেল বলেন, ‘সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুরো জেলায় যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের ভূপ্রকৃতি জটিল হওয়ায় এখানে অভিযান চালানো সব সময়ই চ্যালেঞ্জের। পাহাড়ের ভেতরে অসংখ্য সরু পথ, গহিন ঝোপঝাড় ও ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা বসতি থাকায় অপরাধীরা সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে পারে। এ কারণে গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গেলে র‍্যাব–৭, চট্টগ্রাম এর চার সদস্যকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এ সময় র‍্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব নিহত হন।

এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে বিশেষ নজরদারিতে রাখে। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই মামলার কয়েকজন আসামি পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করেছে—এমন তথ্য পাওয়ার পরই সেখানে নজরদারি বাড়ানো হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওই ঘটনার পর সন্ত্রাসী ও অস্ত্র উদ্ধারে একাধিক অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়। এর অংশ হিসেবেই সোমবার ভোর থেকে এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, অভিযানের সময় পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে সন্দেহভাজন কয়েকটি স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি আশপাশের বসতিগুলোতেও যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে।

এর আগে ২০১৭ ও ২০২২ সালেও প্রশাসন সেখানে অভিযান চালানোর চেষ্টা করলেও নানা কারণে তা পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে এবার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অংশ হিসেবে বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।