চট্টগ্রাম 6:11 pm, Sunday, 31 May 2026

প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান বাস্তবতা: সমস্যা ও উত্তরণের পথ এবং আগামীর বাংলাদেশ

  • Reporter Name
  • Update Time : 12:58:54 pm, Thursday, 14 May 2026
  • 86 Time View

ফাইল ছবি: সোমাইয়া আক্তার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মিরসরাই, চট্টগ্রাম।

ভূমিকা: একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও টেকসই অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে। শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষাগত ধাপ হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা শুধু পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের সুযোগই দেয় না, বরং তার নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও মানবিক গুণাবলির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই স্তরেই শিশুর চিন্তা-চেতনার ভিত নির্মিত হয়, যা তার ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের দিকনির্দেশনা দেয়। প্রকৃতপক্ষে, গুণগত ও কার্যকর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যতীত একটি শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সুতরাং বর্তমান সময়ে এই খাতের সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার বিশ্লেষণ আমাদের ভবিষ্যত বাংলাদেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা বর্তমানে নানাবিধ  পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ‘অ্যানুয়াল প্রাইমারি স্কুল স্ট্যাটিস্টিকস (APSS) ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান নিম্নোক্ত চিত্র পরিলক্ষিত  হচ্ছে:

প্রাথমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬২৫ জন। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ৯৭.৪২%। এক সময় ঝরে পড়ার হার অত্যন্ত বেশি থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৩-১৪% এর আশেপাশে অবস্থান করছে। ২০২১ সালে এটি ছিল ১৪.১৫%।প্রাথমিক  শিক্ষা চক্র শেষ করার হার বর্তমানে প্রায় ৮৫.৮৫%।

সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলিয়ে মোট শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন।১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ৬৫,৬২০টি সরাসরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ক্ষেত্রে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ১:৩০ হলেও বর্তমানে গড়ে এই অনুপাত প্রায় ১:৩৩। তবে শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে এই অনুপাতে ব্যাপক বৈষম্য দেখা যায়।

প্রায় ৭০.৯% প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে কম্পিউটারের সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪৮.৯% বিদ্যালয়ে উন্নত পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে (SDG লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৫ সালে এটি ৮০% করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্স (GPI) অত্যন্ত ইতিবাচক; অর্থাৎ ছাত্র ও ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সমান, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি।সরকার প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি উপবৃত্তি প্রদান করছে।প্রতি বছরের ১লা জানুয়ারি প্রায় ৯-১০ কোটি কপি নতুন বই প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কিছু অসংগতি পরিলক্ষিত হয় যা নিম্নরূপ : শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তর শেষ করেও সঠিক রিডিং বা সাধারণ গাণিতিক হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এখনো অনেক বিদ্যালয়ে দক্ষ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

অবকাঠামোগত দুর্বলতা : শ্রেণী কক্ষ ও শিক্ষা উপকরণের অভাবে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। মুখস্থ নির্ভর গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা: পরীক্ষামুখী মুখস্থ নির্ভর গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ব্যাহত করে।

খেলার মাঠের অপ্রতুলতা: অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকায় শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

 দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাব: দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে বিশেষ করে হাওর, চরাঞ্চল ও বস্তি এলাকার শিশুদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার এখনো উল্লেখযোগ্য।

শহর ও গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত  পার্থক্য বিদ্যমান।

উক্তরণের পথ: বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। গুণগত পরিবর্তনের জন্য নিচের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি:

মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিতকরণ: মেধাবী ও পাঠদানে আগ্রহী তরুণদের এই পেশায় আকৃষ্ট করতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করা।

 আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো: প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা, যাতে তারা আর্থিকভাবে নিশ্চিন্ত থেকে পাঠদানে মনোনিবেশ করতে পারেন।

 বিরামহীন ইন-সার্ভিস ট্রেনিং: প্রথাগত প্রশিক্ষণের বাইরে আধুনিক পেডাগজি (Pedagogy), শিশু মনস্তত্ত্ব এবং ডিজিটাল টুলস ব্যবহারের ওপর নিয়মিত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান।

মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে হাতে-কলমে শিক্ষা এবং চারু ও কারুকলা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে পাঠদান নিশ্চিত করা।

পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা ও বিষয়বস্তু শিশুদের বয়স অনুযায়ী আরও সহজবোধ্য এবং আকর্ষণীয় করা।

 অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন: প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর নিশ্চিত করা।

 ল্যাব ও লাইব্রেরি: প্রতিটি স্কুলে শিশুদের উপযোগী একটি ছোট লাইব্রেরি এবং প্রাথমিক বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ একটি ‘সায়েন্স কর্নার’ থাকা আবশ্যক।

 ওয়াশ (WASH) সুবিধা: স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও নিরাপদ খাবার পানির অভাব যেন শিক্ষার পরিবেশকে বিঘ্নিত না করে সেদিকে নজর দেওয়া।

 শিক্ষকের মানোন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ: কেবল অবকাঠামো গড়লে হবে না, প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক। শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

  কারিকুলামের সঠিক বাস্তবায়ন: সরকার প্রবর্তিত  শিক্ষাক্রম, যা অভিজ্ঞতামূলক শিখনের ওপর জোর দেয়, তার সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে হবে। শ্রেণিকক্ষেই যেন পাঠ সম্পন্ন হয় এবং শিশুদের ওপর থেকে বইয়ের বোঝা কমানো যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

 পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ: ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি দেশব্যাপী বিস্তৃত করা প্রয়োজন যাতে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পুষ্টির পাশাপাশি স্কুলে আসার আগ্রহ পায়।

নন-অ্যাকাডেমিক কাজের বোঝা হ্রাস: ভোটার তালিকা প্রণয়ন বা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের মতো নন-অ্যাকাডেমিক কাজে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা কমিয়ে তাদের পুরো সময় পাঠদানে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া।

 প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্তর্ভুক্তি: প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘ইনক্লুসিভ এডুকেশন’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও র‍্যাম্প নির্মাণ করা।

 আনন্দময় পরিবেশ: বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে শিশুবান্ধব করা, যাতে শিশুরা স্কুলকে জেলখানা মনে না করে একটি খেলার জায়গা হিসেবে পছন্দ করে।

 স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (SMC): কমিটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শক্তিশালী করা।

অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিশুর বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ তদারকি করা।

 রেমেডিয়াল বা নিরাময়মূলক পাঠদান

অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা: নিয়মিত ক্লাসের বাইরে প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ মিনিট পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ‘রেমেডিয়াল ক্লাস’ নেওয়া।

 সহজ থেকে কঠিন: শিশুর বর্তমান শিখন স্তর যাচাই করে একদম সহজ ধাপ থেকে শুরু করা, যেন সে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়।

 দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ: কোন শিশু গণিতে পিছিয়ে আর কে ইংরেজিতে দুর্বল, তা আলাদা করে চিহ্নিত করে একটি প্রোফাইল তৈরি করা। আনন্দময় ও অভিজ্ঞতামূলক শিখন

 হাতে-কলমে শিক্ষা: তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে বাস্তব উপকরণের (কাঠি, মার্বেল, ছবি, মানচিত্র) মাধ্যমে পাঠদান করা। এতে শিশুর স্মৃতিতে বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

 খেলার ছলে শেখা: শব্দজট, কুইজ বা রোল প্লের মাধ্যমে ব্যাকরণ বা বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সহজ করা।

পিয়ার লার্নিং (সহপাঠীর কাছ থেকে শেখা)

 ছোট গ্রুপ তৈরি: ক্লাসের ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের সাথে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছোট ছোট গ্রুপ বা জোড়া (Pair) তৈরি করে দেওয়া। শিশুরা অনেক সময় শিক্ষকের চেয়ে বন্ধুর কাছে বেশি সহজে শেখে।

 টিম ওয়ার্ক: দলগত কাজের মাধ্যমে একে অপরকে সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করা।

 স্কুল-হোম লিংকেজ: শিশু বাড়িতে পড়ছে কি না বা কোনো সমস্যায় পড়ছে কি না তা জানতে নিয়মিত অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করা।

 বাড়িতে অনুকূল পরিবেশ: শিশুকে যেন বাড়িতে অকারণে বকাঝকা না করা হয়, সে ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন করা।

বিশাল ইমারতের জন্য যেমন শক্ত ভিত্তির প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনই একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুনগত প্রাথমিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুজে বের করা সম্ভব।

শিশুদের জন্য একটি আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার, কারণ আজকের সুশিক্ষিত শিশুই আগামীর উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের কারিগর।

 

লেখক : সোমাইয়া আক্তার,
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা,
মিরসরাই, চট্টগ্রাম।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জঙ্গল সলিমপুরে কোনো সন্ত্রাসীর অভয়ারণ্য থাকবে না- হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান বাস্তবতা: সমস্যা ও উত্তরণের পথ এবং আগামীর বাংলাদেশ

Update Time : 12:58:54 pm, Thursday, 14 May 2026

ভূমিকা: একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও টেকসই অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে। শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষাগত ধাপ হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা শুধু পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের সুযোগই দেয় না, বরং তার নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও মানবিক গুণাবলির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই স্তরেই শিশুর চিন্তা-চেতনার ভিত নির্মিত হয়, যা তার ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের দিকনির্দেশনা দেয়। প্রকৃতপক্ষে, গুণগত ও কার্যকর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যতীত একটি শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সুতরাং বর্তমান সময়ে এই খাতের সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার বিশ্লেষণ আমাদের ভবিষ্যত বাংলাদেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা বর্তমানে নানাবিধ  পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ‘অ্যানুয়াল প্রাইমারি স্কুল স্ট্যাটিস্টিকস (APSS) ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান নিম্নোক্ত চিত্র পরিলক্ষিত  হচ্ছে:

প্রাথমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬২৫ জন। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ৯৭.৪২%। এক সময় ঝরে পড়ার হার অত্যন্ত বেশি থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৩-১৪% এর আশেপাশে অবস্থান করছে। ২০২১ সালে এটি ছিল ১৪.১৫%।প্রাথমিক  শিক্ষা চক্র শেষ করার হার বর্তমানে প্রায় ৮৫.৮৫%।

সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলিয়ে মোট শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন।১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ৬৫,৬২০টি সরাসরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ক্ষেত্রে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ১:৩০ হলেও বর্তমানে গড়ে এই অনুপাত প্রায় ১:৩৩। তবে শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে এই অনুপাতে ব্যাপক বৈষম্য দেখা যায়।

প্রায় ৭০.৯% প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে কম্পিউটারের সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪৮.৯% বিদ্যালয়ে উন্নত পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে (SDG লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৫ সালে এটি ৮০% করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্স (GPI) অত্যন্ত ইতিবাচক; অর্থাৎ ছাত্র ও ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সমান, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি।সরকার প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি উপবৃত্তি প্রদান করছে।প্রতি বছরের ১লা জানুয়ারি প্রায় ৯-১০ কোটি কপি নতুন বই প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কিছু অসংগতি পরিলক্ষিত হয় যা নিম্নরূপ : শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তর শেষ করেও সঠিক রিডিং বা সাধারণ গাণিতিক হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এখনো অনেক বিদ্যালয়ে দক্ষ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

অবকাঠামোগত দুর্বলতা : শ্রেণী কক্ষ ও শিক্ষা উপকরণের অভাবে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। মুখস্থ নির্ভর গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা: পরীক্ষামুখী মুখস্থ নির্ভর গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ব্যাহত করে।

খেলার মাঠের অপ্রতুলতা: অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকায় শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

 দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাব: দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে বিশেষ করে হাওর, চরাঞ্চল ও বস্তি এলাকার শিশুদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার এখনো উল্লেখযোগ্য।

শহর ও গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত  পার্থক্য বিদ্যমান।

উক্তরণের পথ: বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। গুণগত পরিবর্তনের জন্য নিচের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি:

মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিতকরণ: মেধাবী ও পাঠদানে আগ্রহী তরুণদের এই পেশায় আকৃষ্ট করতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করা।

 আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো: প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা, যাতে তারা আর্থিকভাবে নিশ্চিন্ত থেকে পাঠদানে মনোনিবেশ করতে পারেন।

 বিরামহীন ইন-সার্ভিস ট্রেনিং: প্রথাগত প্রশিক্ষণের বাইরে আধুনিক পেডাগজি (Pedagogy), শিশু মনস্তত্ত্ব এবং ডিজিটাল টুলস ব্যবহারের ওপর নিয়মিত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান।

মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে হাতে-কলমে শিক্ষা এবং চারু ও কারুকলা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে পাঠদান নিশ্চিত করা।

পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা ও বিষয়বস্তু শিশুদের বয়স অনুযায়ী আরও সহজবোধ্য এবং আকর্ষণীয় করা।

 অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন: প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর নিশ্চিত করা।

 ল্যাব ও লাইব্রেরি: প্রতিটি স্কুলে শিশুদের উপযোগী একটি ছোট লাইব্রেরি এবং প্রাথমিক বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ একটি ‘সায়েন্স কর্নার’ থাকা আবশ্যক।

 ওয়াশ (WASH) সুবিধা: স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও নিরাপদ খাবার পানির অভাব যেন শিক্ষার পরিবেশকে বিঘ্নিত না করে সেদিকে নজর দেওয়া।

 শিক্ষকের মানোন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ: কেবল অবকাঠামো গড়লে হবে না, প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক। শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

  কারিকুলামের সঠিক বাস্তবায়ন: সরকার প্রবর্তিত  শিক্ষাক্রম, যা অভিজ্ঞতামূলক শিখনের ওপর জোর দেয়, তার সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে হবে। শ্রেণিকক্ষেই যেন পাঠ সম্পন্ন হয় এবং শিশুদের ওপর থেকে বইয়ের বোঝা কমানো যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

 পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ: ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি দেশব্যাপী বিস্তৃত করা প্রয়োজন যাতে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পুষ্টির পাশাপাশি স্কুলে আসার আগ্রহ পায়।

নন-অ্যাকাডেমিক কাজের বোঝা হ্রাস: ভোটার তালিকা প্রণয়ন বা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের মতো নন-অ্যাকাডেমিক কাজে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা কমিয়ে তাদের পুরো সময় পাঠদানে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া।

 প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্তর্ভুক্তি: প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘ইনক্লুসিভ এডুকেশন’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও র‍্যাম্প নির্মাণ করা।

 আনন্দময় পরিবেশ: বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে শিশুবান্ধব করা, যাতে শিশুরা স্কুলকে জেলখানা মনে না করে একটি খেলার জায়গা হিসেবে পছন্দ করে।

 স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (SMC): কমিটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শক্তিশালী করা।

অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিশুর বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ তদারকি করা।

 রেমেডিয়াল বা নিরাময়মূলক পাঠদান

অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা: নিয়মিত ক্লাসের বাইরে প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ মিনিট পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ‘রেমেডিয়াল ক্লাস’ নেওয়া।

 সহজ থেকে কঠিন: শিশুর বর্তমান শিখন স্তর যাচাই করে একদম সহজ ধাপ থেকে শুরু করা, যেন সে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়।

 দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ: কোন শিশু গণিতে পিছিয়ে আর কে ইংরেজিতে দুর্বল, তা আলাদা করে চিহ্নিত করে একটি প্রোফাইল তৈরি করা। আনন্দময় ও অভিজ্ঞতামূলক শিখন

 হাতে-কলমে শিক্ষা: তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে বাস্তব উপকরণের (কাঠি, মার্বেল, ছবি, মানচিত্র) মাধ্যমে পাঠদান করা। এতে শিশুর স্মৃতিতে বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

 খেলার ছলে শেখা: শব্দজট, কুইজ বা রোল প্লের মাধ্যমে ব্যাকরণ বা বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সহজ করা।

পিয়ার লার্নিং (সহপাঠীর কাছ থেকে শেখা)

 ছোট গ্রুপ তৈরি: ক্লাসের ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের সাথে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছোট ছোট গ্রুপ বা জোড়া (Pair) তৈরি করে দেওয়া। শিশুরা অনেক সময় শিক্ষকের চেয়ে বন্ধুর কাছে বেশি সহজে শেখে।

 টিম ওয়ার্ক: দলগত কাজের মাধ্যমে একে অপরকে সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করা।

 স্কুল-হোম লিংকেজ: শিশু বাড়িতে পড়ছে কি না বা কোনো সমস্যায় পড়ছে কি না তা জানতে নিয়মিত অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করা।

 বাড়িতে অনুকূল পরিবেশ: শিশুকে যেন বাড়িতে অকারণে বকাঝকা না করা হয়, সে ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন করা।

বিশাল ইমারতের জন্য যেমন শক্ত ভিত্তির প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনই একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুনগত প্রাথমিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুজে বের করা সম্ভব।

শিশুদের জন্য একটি আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার, কারণ আজকের সুশিক্ষিত শিশুই আগামীর উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের কারিগর।

 

লেখক : সোমাইয়া আক্তার,
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা,
মিরসরাই, চট্টগ্রাম।