চট্টগ্রাম 8:00 pm, Saturday, 11 July 2026

মিরসরাই ট্রাজেডির ১৫ বছর : লাল ফিতায় আটকে আছে সড়ক পরিবহন আইন

বছর ঘুরে জুলাইয়ের সেই দিনটি আজও দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে মিরসরাই ট্র্যাজেড়ী। স্বজন হারানোর কান্না যেন ১৫ বছরেই থামে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সাথে এত শিশুর মৃত্যু এই প্রথম। ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা সদরের স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে বড়তাকিয়া–আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকার দক্ষিণ পাশে শিক্ষার্থীবাহী একটি মিনি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের ডোবায় পড়ে যায়। মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় ৪৩ শিক্ষার্থীসহ মোট ৪৫ জন নিহত হন।

২০১১ সালের সেই ভয়াবহ দিনটি আজও কাঁদায় পুরো দেশকে। এই ট্র্যাজেডির পর মূলত চালকদের জন্য কাজের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং সড়ক পরিবহন আইন কঠোর করার জোরালো দাবি ওঠে।

চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণের দাবি এখনো উপেক্ষিত। অনেক চালক টানা ১০-১২ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালান, যার ফলে ক্লান্তি থেকে দুর্ঘটনা বাড়ে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ১১ জুলাইকে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি ছিল। তবে এটি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

চালকদের জন্য উপযুক্ত বেতন, নিয়োগপত্র এবং পেশাদার প্রশিক্ষণের অভাব এখনো রয়ে গেছে।

২০১১ সালের এই দিনের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় স্বজনদের। কান্না, আর্তনাদ আর প্রিয়জন হারানোর বেদনা এখনো ভারী করে তোলে মিরসরাইয়ের আবুতোরাব, মায়ানী ও আশপাশের জনপদের বাতাস।

কারও ভাই, কারও সন্তান, কারও বন্ধু কিংবা সহপাঠী—৪৫টি প্রাণের আকস্মিক মৃত্যু আজও ভুলতে পারেননি স্থানীয় মানুষ। স্বজনদের কাছে স্মৃতির একমাত্র অবলম্বন হয়ে আছে প্রিয়জনদের ছবির ফ্রেম। সেই ছবিই বুকে জড়িয়ে অনেক মা–বাবা এখনো নীরবে চোখের জল ফেলেন। মুহূর্তেই শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে মায়ানী, আবুতোরাব, মঘাদিয়া এবং আশপাশের কয়েকটি গ্রাম।

দুর্ঘটনার ১৫ বছর পরও সেই ডোবার পাশ দিয়ে গেলে অনেকের মনে ফিরে আসে বিভীষিকাময় স্মৃতি। নিহতদের স্বজনদের কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই ১১ জুলাইয়েই।

দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ দেশের বিশিষ্টজনেরা।

নিহতদের স্মরণে ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’। এতে নিহতদের ছবি সংরক্ষণ করা হয়েছে। আর দুর্ঘটনাস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’। প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার জানান, শনিবার সকালে কোরআন খতমের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ১০টায় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’-এ পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। এরপর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও তবারুক বিতরণের আয়োজন রয়েছে। এতে নিহত শিক্ষার্থীদের স্বজন, ট্র্যাজেডিতে আহত ব্যক্তিরা, বর্তমান শিক্ষার্থী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

২০১১ সালের ওই দুর্ঘটনায় আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের ৩৪ জন, আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারজন, আবুতোরাব ফাজিল মাদরাসার দুইজন এবং প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের দুইজন শিক্ষার্থী নিহত হন। এ ছাড়া একজন অভিভাবক ও দুই ফুটবলপ্রেমীও প্রাণ হারান। মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৫

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ও বেইলি সেতু ভেঙে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত, রাঙামাটি-বান্দরবান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

মিরসরাই ট্রাজেডির ১৫ বছর : লাল ফিতায় আটকে আছে সড়ক পরিবহন আইন

Update Time : 07:55:05 pm, Saturday, 11 July 2026

বছর ঘুরে জুলাইয়ের সেই দিনটি আজও দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে মিরসরাই ট্র্যাজেড়ী। স্বজন হারানোর কান্না যেন ১৫ বছরেই থামে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সাথে এত শিশুর মৃত্যু এই প্রথম। ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা সদরের স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে বড়তাকিয়া–আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকার দক্ষিণ পাশে শিক্ষার্থীবাহী একটি মিনি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের ডোবায় পড়ে যায়। মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় ৪৩ শিক্ষার্থীসহ মোট ৪৫ জন নিহত হন।

২০১১ সালের সেই ভয়াবহ দিনটি আজও কাঁদায় পুরো দেশকে। এই ট্র্যাজেডির পর মূলত চালকদের জন্য কাজের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং সড়ক পরিবহন আইন কঠোর করার জোরালো দাবি ওঠে।

চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণের দাবি এখনো উপেক্ষিত। অনেক চালক টানা ১০-১২ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালান, যার ফলে ক্লান্তি থেকে দুর্ঘটনা বাড়ে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ১১ জুলাইকে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি ছিল। তবে এটি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

চালকদের জন্য উপযুক্ত বেতন, নিয়োগপত্র এবং পেশাদার প্রশিক্ষণের অভাব এখনো রয়ে গেছে।

২০১১ সালের এই দিনের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় স্বজনদের। কান্না, আর্তনাদ আর প্রিয়জন হারানোর বেদনা এখনো ভারী করে তোলে মিরসরাইয়ের আবুতোরাব, মায়ানী ও আশপাশের জনপদের বাতাস।

কারও ভাই, কারও সন্তান, কারও বন্ধু কিংবা সহপাঠী—৪৫টি প্রাণের আকস্মিক মৃত্যু আজও ভুলতে পারেননি স্থানীয় মানুষ। স্বজনদের কাছে স্মৃতির একমাত্র অবলম্বন হয়ে আছে প্রিয়জনদের ছবির ফ্রেম। সেই ছবিই বুকে জড়িয়ে অনেক মা–বাবা এখনো নীরবে চোখের জল ফেলেন। মুহূর্তেই শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে মায়ানী, আবুতোরাব, মঘাদিয়া এবং আশপাশের কয়েকটি গ্রাম।

দুর্ঘটনার ১৫ বছর পরও সেই ডোবার পাশ দিয়ে গেলে অনেকের মনে ফিরে আসে বিভীষিকাময় স্মৃতি। নিহতদের স্বজনদের কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই ১১ জুলাইয়েই।

দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ দেশের বিশিষ্টজনেরা।

নিহতদের স্মরণে ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’। এতে নিহতদের ছবি সংরক্ষণ করা হয়েছে। আর দুর্ঘটনাস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’। প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার জানান, শনিবার সকালে কোরআন খতমের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ১০টায় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’-এ পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। এরপর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও তবারুক বিতরণের আয়োজন রয়েছে। এতে নিহত শিক্ষার্থীদের স্বজন, ট্র্যাজেডিতে আহত ব্যক্তিরা, বর্তমান শিক্ষার্থী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

২০১১ সালের ওই দুর্ঘটনায় আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের ৩৪ জন, আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারজন, আবুতোরাব ফাজিল মাদরাসার দুইজন এবং প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের দুইজন শিক্ষার্থী নিহত হন। এ ছাড়া একজন অভিভাবক ও দুই ফুটবলপ্রেমীও প্রাণ হারান। মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৫